সালথায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের ঘর নির্মাণে অনিয়ম-অর্ধেক বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ


ফরিদপুরের সালথায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের মডেল ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং ঠিকাদার প্রতিটি ঘরের অর্ধেক বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
কিছু কৃষক বলেছে ঘর নির্মানের যে টাকা বরাদ্দ হয়েছে শুনেছি তার তিন ভাগের এক ভাগ টাকার কাজ হয়েছে। অন্য একজন কৃষক জানায় এই ঘর করতে মনে হয় সর্বচ্চ দুই লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে এর বেশি নয়। এবং একই গ্রামের একই পাড়ায় দুইটি ঘর দেওয়া হয়েছে এটা বুজতে বাকি থাকনো যে এর মধ্যে কিছু একটা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত যোগ্য কৃষকদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য কৃষকদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যারা এই মডেল ঘর পেয়েছে তাদের ঘর নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি। অথচ পেঁয়াজ উঠানো শেষ হয়েছে আরো একমাস আগে। এ কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, বরাদ্দ পাওয়া কৃষকদের প্রশিক্ষণের বরাদ্দও খেয়ে ফেলেছেন কর্মকর্তারা।জানা গেছে, ফলন ও দাম ভাল হওয়ায় প্রতিবছরই সালথায় বাড়ছে পেঁয়াজের আবাদ।
কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এখানকার উৎপাদিত পচনশীল ফসল পেঁয়াজের ২৫-৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে পেঁয়াজ চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমন অবস্থায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল প্রান্তিক পেঁয়াজ চাষিরা। এর ফলে এই বছর কৃষিবিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে সালথায় ৪৫টি ঘরের বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সালথা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের নাম পাঠালেও কোনো কৃষক ঘর পাননি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা শাহজাহান আলী ও আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণাগার নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হেলাল উদ্দিনের যোগসাজশে ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে এ সব সরকারি ঘর।

এ ছাড়া ঘরের ডিজাইন বিকৃত করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘর নির্মাণ অথবা বিতরণের বিষয়ে কোনো মতামত নেওয়া হচ্ছে না সালথা উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের। এমনকি সালথা উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসে এ সব ঘরের তালিকা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ প্রতিটি ঘর বাড়ির উঠান বা ফাঁকা জায়গায় মাত্র এক শতাংশ জমিতে টিন-বাঁশ, লোহা ও কংক্রিটের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে।এই ঘরের আয়তন প্রায় ৩৭৫ বর্গফুট।
প্রতিটি ঘরে বাতাস চলাচলের জন্য ছয়টি বায়ু নিষ্কাশন পাখা সংযুক্ত রয়েছে। মূলত ভ্যান্টিলেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকার কারণেই সংরক্ষিত পেঁয়াজ পচবে না। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য প্রতিটি ঘরে হাইগ্রোমিটার রয়েছে। প্রতিটি ঘরে সংরক্ষণ করা যায় সাড়ে ৩০০-৪০০ মণ পেঁয়াজ। প্রতিটি ঘরে আলাদা আলাদা স্তরে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন অন্তত পাঁচজন কৃষক।
এ ঘরে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো থাকে।পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য প্রতিটি ঘর গত বছরের নভেম্বর মাসে ফরিদপুরের মেসার্স জাকির এন্ড ব্রাদার্স ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সাত শতাংশ লেস দিয়ে এই ঘরগুলোর কাজ শুরু করে। চলতি বছরের ৩০ মার্চ ঘরের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে এখনো ঘরগুলোর কাজ শেষ হয়নি।
অধিকাংশ ঘরের কাজ শুরু করলেও একটি ঘরের কাজও সম্পূর্ণ করতে পারেনি। এমনকি কিছু কিছু ঘরের কাজ এখনো শুরুই করা হয়নি। পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণের দেশীয় মডেল ঘরের আশায় পেঁয়াজ চাষিরা তাদের পুরাতন ঘর মেরামত না করায় এখন পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। এ ছাড়া মডেল ঘর পাওয়ার জন্য সালথা উপজেলা কৃষি অফিসে ৭০ জন কৃষক আবেদন করেন।
কৃষি অফিস যাচাই-বাছাই করে ৩০ জন কৃষকের নাম প্রকল্প পরিচালকের নিকট পাঠানো হয়। কিন্তু এই তালিকা থেকে কাউকেই ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা শাহজাহান আলী ও আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণাগার নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হেলাল উদ্দিনের যোগসাজশে ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে এসব সরকারি ঘর। এনিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া কৃষকদের দাবি, সালথায় যেন পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সরকার আরো ঘর বা পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা কৃষি অফিসের মাঠ কর্মীরা জানান, ৪৫টি মডেল ঘরের আওতায় ৪৫০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া কথা। প্রশিক্ষণ বাবদ প্রত্যেক কৃষকের জন্য এক হাজার করে টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেই হিসেবে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু মাত্র
৪০-৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অতএব কৃষকদের প্রশিক্ষণ বরাদ্দ থেকেই অন্তত চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া প্রতিটি ঘরই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঘর নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ও ডিজাইন পরিবর্তন করে প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদন
দৈনিক ভোরের বার্তা
About Author
Leave a reply
You must be logged in to post a comment.







